১/১১-এর নেপথ্য কারিগর: রিমান্ডে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি

১/১১-এর নেপথ্য কারিগর: রিমান্ডে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি





দীর্ঘদিন ক্ষমতার আড়ালে থাকা এবং পরবর্তীকালে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে নাম আসা সেনাবাহিনীর সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এখন আইনি জালে বন্দি। সম্প্রতি পাঁচ দিনের রিমান্ডে থাকা এই কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে ২০০৭ সালের সেই বহুল আলোচিত 'ওয়ান-ইলেভেন' বা ১/১১ সরকার গঠনের নেপথ্য কাহিনী। তদন্তকারী সূত্রের বরাতে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সেই সময়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পেছনে ছিল এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।

‘র’-এর নীল নকশা ও দেশীয় কুশীলব 

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদের শেষ দিকেই বাংলাদেশে একটি ভিন্নধর্মী শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পরিকল্পনা শুরু করে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)। অভিযোগ উঠেছে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎকালীন ডিজিএফআই-এর কতিপয় কর্মকর্তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এমনকি জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক দপ্তরের নাম ব্যবহার করে একটি ‘ভুয়া চিঠি’ তৈরির মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে ভীতি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে রিমান্ডে তথ্য মিলেছে।

দায় এড়ানোর চেষ্টা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল 

তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তিনি ১/১১-এর বিতর্কিত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা এবং তথাকথিত ‘কিংস পার্টি’ গঠনের পুরো দায় তৎকালীন প্রভাবশালী তিন সামরিক কর্মকর্তা—মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। তবে তদন্তকারীরা বলছেন, নবম ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি হিসেবে মাঠ পর্যায়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে বেশি হার্ডলাইনের।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও ক্ষমতা দখল   

রিমান্ডে থাকা এই কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনের লগি-বৈঠা দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ছিল একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ, যা দেশে এক ভয়াবহ অরাজকতা তৈরি করেছিল। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন মঈন উ আহমেদ ও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

আর্থিক কেলেঙ্কারি ও মানবপাচার সিন্ডিকেট

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কেবল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগই নয়, বরং আকাশচুম্বী আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণও মিলছে।

  • শ্রমিক রপ্তানি সিন্ডিকেট: মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নাম করে ‘ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল’ নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

  • অর্থ পাচার: ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে এই বিশাল অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি অধিকাংশ সময় নীরব থাকছেন।

জুলাই গণহত্যাকাণ্ড ও বর্তমান পরিস্থিতি 

সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফেনীর মহিপালে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় অন্যতম প্রধান আসামি হিসেবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে ১১টি মামলা দায়ের হয়েছে। গত ২৩ মার্চ বারিধারা থেকে আটকের পর আদালত প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষের প্রচণ্ড ক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি, যেখানে তাকে লক্ষ্য করে ময়লা পানি ও পোড়া মবিল নিক্ষেপ করা হয়।


দৃষ্টি আকর্ষণ: এটি একটি সংবাদ বিশ্লেষণধর্মী খসড়া। আপনি কি এর সাথে যুক্ত কোনো নির্দিষ্ট আইনি নথিপত্র বা দুর্নীতির খতিয়ান সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে চান?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ